বিভীষিকার মাঝেই প্রতিবাদের ঝড়

Tipsmela.Com

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোররাতের হঠাৎ বিভীষিকা গোটা জাতিকে দিশাহারা করে দিলেও থামিয়ে রাখতে পারেনি প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। চরম প্রতিকূল পরিবেশে খুনিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই বিভিন্ন জায়গায় বহু মানুষ নেমে আসে রাস্তায়; বজ্রকণ্ঠে জানায় প্রতিবাদ, ঘৃণা। জাতির পিতা হত্যার প্রতিশোধ আর ঘাতকদের প্রতিরোধে আরেক যুদ্ধের প্রস্তুতিও চলে অনেক জায়গায়; অচিরেই শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ আন্দোলন।

১৫ আগস্ট সকালেই সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ হয় বরগুনা, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, খুলনা, যশোর, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, ময়মনসিংহের গফরগাঁও প্রভৃতি স্থানে। প্রতিশোধ-প্রতিরোধের ডাক দিয়ে জীবন উৎসর্গ করে শতাধিক তরুণ। কারাগারে নিক্ষিপ্ত হতে হয়, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে হয় সারা দেশের কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে। ফাঁসির দণ্ডের মুখোমুখিও হতে হয় প্রতিবাদকারীকে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল ৬টায় বাঙালি জাতিকে বেতারে শুনতে হয়েছিল এই ঘোষণা—‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। ’ জাতির জনককে হত্যার খবরের সঙ্গে সামরিক শাসন ও কারফিউ জারির ঘোষণাও দেওয়া হয়। বঙ্গভবন, শাহবাগের বেতারকেন্দ্র এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ট্যাংক ও মেশিনগান নিয়ে অবস্থান নেয় খুনিচক্রের অনুসারী সেনা সদস্যরা। সারা দেশে ক্যাম্প স্থাপন করে অবস্থান নেয় সেনারা।

নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় বাকশাল ও এর সব অঙ্গসংগঠন। রাজনীতি নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ সভা-সমাবেশ-মিছিল। রাতে কারফিউ। দিনে সেনা টহল। রাজনৈতিক নেতাদের ধরপাকড় শুরু হয়। সারা দেশে তৈরি হয় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। সংবাদপত্রের ওপর আরোপ করা হয় নিষেধাজ্ঞা। খবরাখবর জানার মাধ্যম তখন কেবল বেতার। সরকারি বেতারে চলতে থাকে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বিরামহীন অপপ্রচার ও কুৎসা রটনা। সামরিক নিষেধাজ্ঞা অমান্যের শাস্তির বিধান স্মরণ করিয়ে দেওয়া হতে থাকে ক্ষণে ক্ষণে। ভারতকে জড়িয়েও শুরু হয় নানা প্রচারণা। সারা দেশে নানা গুজব ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তখনো বঙ্গবন্ধুর লাশ ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সিঁড়িতে—দুপুর ১টায় বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভারই সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমদকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। মুজিব কোট পরে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার কিছু সদস্য মোশতাক মন্ত্রিসভায় শপথ গ্রহণ করেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী পরিস্থিতি ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সম্পর্কে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন (তখন বাকশালের ছাত্রসংগঠন ছিল জাতীয় ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন মিলে ছিল এই সংগঠন) নেতা, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রত্যক্ষ প্রতিবাদকারী, বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা নূহ-উল-আলম লেনিন সেই ঘটনা নিয়ে প্রণীত গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘পনের আগস্টের ঘটনার আকস্মিকতায় নেতারা হতবিহ্বল ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাঁরা কথা বলতে রাজি হননি। কেউ কেউ আত্মরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাত্ক্ষণিক মোকাবেলার নির্দেশ দিতে, ভরসা দিতে, সাহস দিতে তাঁরা ছিলেন অক্ষম। অথচ মাত্র সাড়ে তিন বছর আগে ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে আওয়ামী লীগের যেসব নেতা পাকিস্তানি হানাদারদের সর্বাত্মক আক্রমণ, গণহত্যা ও মৃত্যু পরোয়ানাকে উপেক্ষা করে প্রতিরোধে জাগিয়ে তুলেছিলেন সমগ্র বাঙালি জাতিকে, এখন সুড়সুড় করে খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগদান করে অথবা প্রতিরোধের চেষ্টা না করে আত্মরক্ষায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে চরম মেরুদণ্ডহীনতার পরিচয় দেবেন—এটা কেউ কল্পনা করতে পারেননি। তবে এটাও সত্য, এমন পাশব হিংস্র হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে, বঙ্গবন্ধুকে তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্য ও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সহকর্মীদের কেউ হত্যা করতে পারে, সেও ছিল সবার ধারণার বাইরে। এ অবস্থায় একদিকে দল ও নেতৃত্ব অপ্রস্তুত, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ঘটনার আকস্মিকতায় এবং হিংস্রতার ভয়াবহতম রূপ দেখে ভীত ও বিহ্বল হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার সহকর্মীদেরই মোশতাকের নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় শপথ নিতে দেখে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের মধ্যে হতাশা ও বিভ্রান্তি দেখা দেয়। তারা নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নিরস্ত্র হয়ে পড়ে। ফলে তাত্ক্ষণিক প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ তেমন দেখা যায়নি। ’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, কেউ কেউ বলে থাকেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশের কোথাও কোনো প্রতিবাদ হয়নি! সারা দেশে কারফিউ দিয়ে যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল তাতে প্রতিবাদ নয়, পাঁচজন মানুষ একত্র হতে পারেনি। দেশের অনেক জায়গায় সাপ্তাহিক হাট পর্যন্ত বসতে দেওয়া হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন মনে করেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশে যে রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল তা প্রতিবাদ করার মতো অনুকূলে ছিল না। গোটা জাতি বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল। মানুষ ভাবতে পারেনি একাত্তরের পর আরেকটি গণহত্যা সংঘটিত হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর মতো মানুষকে কেউ হত্যা করতে পারে। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনিচক্রই ক্ষমতায় ছিল। মানুষ তাত্ক্ষণিকভাবে প্রকৃত ঘটনা বুঝে উঠতে পারেনি। ফলে তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ তেমন হয়নি। তবে মানুষ যখন অনুধাবন করতে পেরেছে তখনই বিচ্ছিন্নভাবে হলেও প্রতিবাদ করেছে। সেই প্রতিবাদের কথা অনেকেরই জানা নেই। আমাদের দায়িত্ব হলো সেগুলোকে তুলে আনা। ’

প্রচলিত ধারণা—বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কেউ চোখের জল ফেলেনি, কোথাও কোনো ধরনের প্রতিবাদ হয়নি। এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালিয়ে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধিদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে নেমে আসা নির্যাতনের চিত্র। অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, ১৫ আগস্ট সকালেই বরগুনায় বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদসভা ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মোশতাক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে এই প্রতিবাদের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন বরগুনা মহকুমা প্রশাসক, পরবর্তী সময়ে সরকারের সচিব সিরাজুদ্দিন আহমেদ। তিনি তাঁর বাসভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখেন। ১৫ আগস্ট সকালে কিশোরগঞ্জ শহরের গৌরাঙ্গবাজারে জেলা ছাত্র ইউনিয়ন কার্যালয় থেকে ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে বের হয় বিক্ষোভ মিছিল। মিছিল শেষে সভা করতে গেলে তা পুলিশি বাধায় পণ্ড হয়ে যায়। ১৫ আগস্ট সকালেই প্রতিবাদসভা ও গায়েবানা জানাজা হয়েছিল নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে। এরপর সেখানে নেমে এসেছিল নারকীয় নির্যাতন। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজের ছাত্রলীগের কর্মীরা ১৫ আগস্ট সকালে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে মিছিল করে। বিকেলেও প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ১৬ আগস্টও দৌলতপুর-খালিশপুর এলাকায় মিছিল হয়। খুলনার ছাত্র ইউনিয়ন বিক্ষোভ মিছিল, লিফলেট বিতরণ ও পোস্টারিং করে। বিএল কলেজে লিফলেট বিতরণ করতে গিয়ে আটক হয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা পরে সাংবাদিক মানিক সাহা, যিনি আততায়ীর দ্বারা নিহত হয়েছেন।

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে ১৭ আগস্ট থেকে শুরু হয় প্রতিবাদ মিছিল। সরকারি দপ্তরে উত্তোলন করা হয় কালো পতাকা। ফলে শুরু হয় সরকারি বাহিনীর নির্যাতন। দীর্ঘ নির্যাতনের পর কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয় কয়েকজন। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ৩০ আগস্ট যশোর ঈদগাহ ময়দানে বঙ্গবন্ধুর গায়েবানা জানাজার আয়োজন করেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল ইসলাম। আগস্টেই তিনি হেঁটে টুঙ্গিপাড়া গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করেন। এ কারণে তাঁকে জেল খাটতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর পেয়ে ময়মনসিংহের গফরগাঁও স্টেশন মাস্টার জয়নাল আবেদীন মিষ্টি বিতরণ করেন। এতে বঙ্গবন্ধুপ্রেমীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর বিস্ফোরণ ঘটে নভেম্বরে এসে। দেড় হাজার মানুষের মিছিল গিয়ে আক্রমণ চালায় স্টেশনে। আক্রোশের শিকার হন স্টেশন মাস্টার। ভাঙচুর চালানো হয়। সে ঘটনায় ৪৫ জনের নামে মামলা হয়। ফলে অনেককেই জেল খাটতে হয়। কিশোরগঞ্জের ভৈরবে পরের বছর বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী পালনেও বাধা দেওয়া হয়েছিল। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর স্মরণে মিলাদ মাহফিল ও কোরআন খতমের আয়োজন করার কারণে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ২২ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়।

১৫ আগস্ট ছাত্রনেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রতিবাদের চেষ্টা করলেও সেনা সদস্যদের কড়া টহলের কারণে ব্যর্থ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিবাদ হয় দেড় মাস পর বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর। ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি দিবস’ ঘোষণা করে কর্মসূচি পালন করে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। সেই প্রতিবাদের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে নূহ-উল-আলম লেনিন ও অজয় দাশগুপ্ত রচিত ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড : প্রতিবাদের প্রথম বছর’ গ্রন্থে।

আগস্ট মাসেই কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সশস্ত্র প্রতিরোধ। গঠিত হয় জাতীয় মুক্তিবাহিনী। এতে অংশ নিয়ে আত্মাহুতি দেয় শতাধিক দ্রোহী তরুণ। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার হয়রানির শিকার হয় প্রায় ছয় হাজার প্রতিরোধ যোদ্ধা। নজিরবিহীন কড়াকড়ি আর সামরিক রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই এসব প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ও উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কবিরুল ইসলাম বেগ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে যোগ দিয়েছিলেন কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় মুক্তিবাহিনীতে। তিনি ডুমনীকুড়া ক্যাম্পের ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করেন।

কবিরুল ইসলাম বেগ কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৯ মাস সীমান্ত এলাকায় প্রতিরোধ লড়াইয়ে তিনি যুক্ত ছিলেন। তাঁকে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হস্তান্তর করার পর প্রায় ২৬ মাস জেল খেটে মুক্তি পান। তিনি বলেন, ‘যাঁর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লাম, তাঁকেই হত্যা করার পর যদি আমরা প্রতিবাদ না করতাম তাহলে জাতি হিসেবে আমরা কলঙ্কিত হতাম। ’ অনেকে বলেন বঙ্গবন্ধুর জন্য কেউ চোখের জল ফেলেনি, কেউ প্রতিবাদ করেনি—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা ভুল, এটা মিথ্যা। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আমরা কয়েক হাজার তরুণ প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। ’ তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারীদের নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘প্রতিরোধ যোদ্ধা পরিষদ’। তাঁদের দাবি, প্রতিরোধ যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কারণ কোনো স্বীকৃতি না থাকায় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের একসময় সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়েছে। এই অপবাদ থেকে তাঁরা মুক্তি চান।

লড়াইয়ের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে কবিরুল ইসলাম বেগ বলেন, খুবই কষ্টের ছিল সেই জীবন। অনেক সময় ভাতের বদলে জাউ খেতে হয়েছে। ছিল লবণ ছাড়া তরকারি। কলাগাছের মোচাও খেতে হতো। কাঁঠালের মুচি খেয়েও দিন কাটিয়েছেন। এর পরও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্পে সবাই ছিলেন অটল। তিনি জানান, একসময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হালুয়াঘাটের বাড়ি থেকে তাঁর বাবা ও দুই ভাইকে ধরে নিয়ে যায়। তখন তাঁর ছোট ছেলের বয়স মাত্র আড়াই বছর।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময়কালে জাতীয় ফুটবল দল ছিল মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের মারদেকা টুর্নামেন্টে। সেখানে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পুত্র আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামালের হত্যাকাণ্ডের খবর গেলে তৎকালীন আবাহনী দলের খেলোয়াড় সালাহউদ্দিন, চুন্নুদের উদ্যোগে বাংলাদেশের খেলার দিন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। খেলার শুরুতে খেলোয়াড়রা এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।

খন্দকার মোশতাক সামরিক শাসন জারি করলেও সংসদ বহাল রাখেন। এমপিদের দুই-তিনজন ছাড়া সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের। ১৬ অক্টোবর এমপিদের বৈঠক ডাকেন মোশতাক। ১০ জনের মতো এমপি মোশতাকের বৈঠক বর্জন করেন। যোগ দেন ২৭০ জন। তেজগাঁও এমপি হোস্টেলে আয়োজিত সে বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্র ফারুক-রশীদ-হুদা-ডালিম-শাহরিয়ার-নূর প্রমুখ উপস্থিত হন। বৈঠকের শুরুতেই কয়েকজন এমপি সভাস্থলে খুনিদের উপস্থিতির আপত্তি জানান। একপর্যায়ে খুনিচক্রের সদস্যরা চলে যেতে বাধ্য হয়। এমপিদের কয়েকজন তাঁদের বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার নিন্দা জানান। অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক (প্রয়াত) মোশতাকের ক্ষমতা দখলকে অবৈধ বলে অভিহিত করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫-এর ২৩ আগস্ট থেকে রাজধানীতে শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। মোশতাকের সঙ্গে হাত মেলাননি আওয়ামী লীগের যেসব নেতা তাঁদের জেলখানায় বন্দি করা হয়। প্রথম দিনই গ্রেপ্তার হন ২৬ জন। যাঁদের মধ্য থেকে শীর্ষ চার নেতাকে ৩ নভেম্বর জেলাখানার নিরাপত্তা হেফাজতে হত্যা করা হয়। ক্ষমতার দৃশ্যপটে মোশতাককে সরিয়ে দখল নেন মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৫ আগস্টের কারফিউ জারির পর থেকেই সারা দেশে দমন-পীড়ন শুরু করে সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নেতাদের গ্রেপ্তার অভিযান জেলাপর্যায় ছাড়িয়ে থানাপর্যায়ে পৌঁছায়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ, সিপিবি, জাসদ নেতাদের নির্বিচার গ্রেপ্তারের ফলে ভরে ওঠে সারা দেশের জেলখানা। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বঙ্গবন্ধু, জয় বাংলা ইত্যাদি উচ্চারণ নিষিদ্ধ করে রাখে ক্ষমতাসীনচক্র। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী পালনেও বাধা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধুর বাসভবন অফিসের কর্মকর্তা মুহিতুল ইসলামের জীবদ্দশায় দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা রুজু করতে লালবাগ থানায় গিয়েছিলেন ১৯৭৬ সালের ২৩ অক্টোবর। কিন্তু এজাহারের বিবরণ শুনে মামলা না নিয়ে ডিউটি অফিসার মুহিতুল ইসলামের গালে থাপ্পড় মেরে বলেছিলেন, ‘তুইও মরবি, আমাদেরও মারবি।

Add a Comment